তর্পণ কোথায় হবে? আগরতলার ধর্মপ্রাণ মানুষ বিভ্রান্তির শিকার
প্রসঙ্গত, গত ২৬ সেপ্ঢেম্বর সকালে পথচারীরা এই দিঘিতে মাঝবয়েসি এক ব্যক্তির মৃতদেহ ভেসে উঠতে দেখেছেন৷ এই বিষয়টি থানা বা আদালতে আইনি পর্যায়ে রয়েছে৷ মানে আইনিভাবে যা করার তা করা হয়েছে কিন্তু সনাতনী ধর্ম মতে ১১ দিন পরেও কোনও বিধান মানার চেষ্টা দেখতে পাওয়া যায় নি৷ অথচ আর দুই রাত ঘুরেই পিতৃপক্ষের শেষ পর্যায়ে পূর্বপুরুষের জন্য তিল জল অর্পণ শুরু হবে৷ যেহেতু এই শহরের পাশে কোনও বড় নদী নেই তাই রাজন্যকাল থেকেই এই শহরের মানুষ লক্ষীনারায়ণ দিঘিতে তর্পণ করে আসছেন পরম্পরায়৷ কিন্তু সেই পরম্পরা রক্ষায় দিঘির মালিক লক্ষ্মীনারায়ণ মন্দির কর্তৃপক্ষের কোনও উদ্যোগ নেই৷

প্রতিবাদী কলম প্রতিনিধি, আগরতলা, ৭ অক্টোবর৷৷ সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস এবং লোকাচার অনুসারে তর্পণের দিঘি বা যেকোনো পবিত্র জলাশয়ে কারোর অপমৃত্যু বা আত্মহত্যা ঘটলে তাৎক্ষণিকভাবে আইনি পদক্ষেপের পাশাপাশি ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে নির্দিষ্ট কিছু করণীয় রয়েছে৷ কিন্তু আগরতলায় তর্পণের বৃহৎ দিঘি লক্ষ্মীনারায়ণ মন্দিরের দিঘিতে পিতৃপক্ষের তর্পণের মুখে ধর্মীয় কোনও বিধি পালন করা হল না, যদিও হাতে আর বাকি মাত্র দুইটি রাত৷ এরপর কাকভোরে শুরু হবে পিতৃপক্ষের তর্পণ৷ যারা পরম্পরায় এই ভোরে এই দিঘিতে তর্পণ করে থাকেন তারা আশাহত হচ্ছেন৷
প্রসঙ্গত, গত ২৬ সেপ্ঢেম্বর সকালে পথচারীরা এই দিঘিতে মাঝবয়েসি এক ব্যক্তির মৃতদেহ ভেসে উঠতে দেখেছেন৷ এই বিষয়টি থানা বা আদালতে আইনি পর্যায়ে রয়েছে৷ মানে আইনিভাবে যা করার তা করা হয়েছে কিন্তু সনাতনী ধর্ম মতে ১১ দিন পরেও কোনও বিধান মানার চেষ্টা দেখতে পাওয়া যায় নি৷ অথচ আর দুই রাত ঘুরেই পিতৃপক্ষের শেষ পর্যায়ে পূর্বপুরুষের জন্য তিল জল অর্পণ শুরু হবে৷ যেহেতু এই শহরের পাশে কোনও বড় নদী নেই তাই রাজন্যকাল থেকেই এই শহরের মানুষ লক্ষীনারায়ণ দিঘিতে তর্পণ করে আসছেন পরম্পরায়৷ কিন্তু সেই পরম্পরা রক্ষায় দিঘির মালিক লক্ষ্মীনারায়ণ মন্দির কর্তৃপক্ষের কোনও উদ্যোগ নেই৷ প্রসঙ্গত, মন্দির বা দেবোত্তর আইনে পশ্চিম জেলার জেলাশাসক হলেন মন্দিরের প্রধান সেবাইত৷ তাকেই ধর্ম রক্ষায় উদ্যোগ নেওয়ার কথা৷ কিন্তু তাঁর দপ্তরের তরফে এখনও সেই ধরনের কোনও উদ্যোগ না দেখে এই শহরের সনাতনী ধর্মপ্রাণ মানুষ আশঙ্কা আর দুশ্চিন্তায় রয়েছেন৷
শাস্ত্রীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, কোনো পবিত্র জলাশয়ে অপমৃত্যু ঘটলে বা মৃতদেহ দীর্ঘক্ষণ থাকলে সেই জল সাময়িকভাবে অশুদ্ধ বা অপবিত্র বলে গণ্য হয়৷ দিঘি পুনরায় ব্যবহারের উপযোগী করতে যেসব ধর্মীয় সংস্কারের বিধান পাওয়া যায় তার মধ্যে তালিকা অনুযায়ী, দিঘির মালিককে প্রায়শ্চিত্ত করতে পুজো দিতে হয় কোনও অমাবস্যার রাতে৷ দ্বিতীয়ত, পঞ্চগব্য বা গঙ্গাজল ছিটিয়ে দিঘির জল শুদ্ধ করার জন্য পুরো জলাশয়ে বা প্রধান প্রধান ঘাটে গঙ্গাজল, গোমূত্র, গোময়, দুধ, দই ও ঘি (পঞ্চগব্য) মিশ্রিত করে ছিটানো হয়৷ তৃতীয়ত, শান্তিস্বস্ত্যয়ন ও পুণ্যাহ বাচন৷ পুরোহিতের পরামর্শ নিয়ে দিঘির পাড়ে বা মন্দিরে শ্রীবিষ্ণুর স্মরণ, নারায়ণ পূজা এবং বিশেষ শান্তি যজ্ঞের আয়োজন করা হয়৷ চতুর্থত, ঘাট বন্ধ রাখা ও জল ব্যবহার নিষিদ্ধকরণ৷ শাস্ত্রীয় শুদ্ধিকরণ প্রক্রিয়া বা পূজাপাঠ শেষ না হওয়া পর্যন্ত ওই দীঘির জল কোনো দেবকার্য, পূজা বা রান্নাবান্নার কাজে ব্যবহার করা নিষেধ৷ পঞ্চমত, যেহেতু এটি একটি ‘অপমৃত্যু’ (স্বাভাবিক মৃত্যু নয়), তাই হিন্দু পুরাণ (গরুড় পুরাণ) অনুযায়ী মৃতের আত্মার সদ্গতির জন্য বিশেষ কিছু বিধান থাকবে৷
যেমন, নারায়ণ বলি বা ত্রিপিন্ডী শ্রাদ্ধ৷ অপমৃত্যুর কারণে আত্মার যে ‘প্রেতত্ত্ব’ বা অশান্ত দশা তৈরি হয়, তা দূর করতে সাধারণ শ্রাদ্ধের পাশাপাশি নারায়ণ বলি অনুষ্ঠান করা অত্যন্ত জরুরি৷ যেহেতু জেলার প্রশাসনিক প্রধান এই দিঘির মালিক তাই তাঁর সামাজিক ও পরিবেশগত সচেতনতা এই ক্ষেত্রে বিবেচ্য হবে৷ যেমন, জল পরীক্ষা৷ যদি মরদেহ দীর্ঘক্ষণ জলের নিচে থাকে, তবে ব্যাকটেরিয়া বা দূষণ ছড়ানোর ঝুঁকি থাকে৷ ধর্মীয় শুদ্ধিকরণের পাশাপাশি ব্লিচিং পাউডার বা চুন দিয়ে জল জীবাণুমুক্ত করা উচিত৷ দ্বিতীয়ত, নিরাপত্তা বেষ্টনী৷ ভবিষ্যতে এমনকি তর্পণের সকালে ভিড়াভিড়িতে যাতে দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয় সেই জন্য দিঘির গভীর অংশে বা ঝুঁকিপূর্ণ ঘাটে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড বা নিরাপত্তামূলক রেলিং দেওয়া উচিত৷ এমন বড় দিঘি বা তর্পণের মতন ঐতিহ্যবাহী জলাশয়ের ক্ষেত্রে এই নিয়মগুলো পালনের জন্য শুধু মন্দির কমিটি এবং পুরোহিত মহাশয়ের প্রত্যক্ষ নির্দেশনা যথেষ্ট নয়৷ দরকার সেবাইতের দপ্তরের হস্তক্ষেপ৷ কিন্তু দুর্ভাগ্য যে প্রধান সেবাইতের অফিস ঘটনার ১৩ দিন পরেও নির্বিকার৷
জানা গেছে, শান্তি স্বস্ত্যয়নের সাপেক্ষে মন্দিরের প্রধান পুরোহিত মন্দিরের ঘাট বন্ধ করে রেখেছেন, যাতে কেউ দিঘির জল পূজা, অর্চনার জন্য ব্যবহার না করতে পারেন৷ সেই জন্য নির্দেশ জারি করেছে৷ কিন্তু এতো বড় দিঘির আরও কয়েকটি ঘাট রয়েছে৷ বিক্রয় কর ভরনের সামনের ঘাট, টাউন হলের সামনের ঘাট, কালী মন্দির সংলগ্ণ ঘাট থেকে যে কেউ অজ্ঞতাবশত ধর্মীয় কারণে জল ব্যবহার করে ফেলতে পারেন৷ সেই দায় পুরোহিতের পক্ষে একা নেওয়া সম্ভব নয়৷ প্রয়োজন সেবাইতের ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপ৷ কিন্তু যে দেশের কেন্দ্র ও রাজ্যের সরকার সনাতন ধর্মের পৃষ্ঠপোষক সেই দেশের অঙ্গরাজ্যের একটি জেলা প্রশাসন এতো উদাসীন কিভাবে --- এই নিয়ে প্রশ্ণ উঠেছে পিতৃপক্ষের তর্পণের মুখে৷