নার্স নেই, নিয়োগ নেই—স্বাস্থ্য পরিষেবার মেরুদণ্ড ভেঙে পড়লেও নির্বিকার ডাবল ইঞ্জিনের সরকার
অভিযোগ, গত সাত-আট বছর ধরে রাজ্যে নিয়মিত নার্স নিয়োগ কার্যত বন্ধ। অথচ রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পরিধি ও রোগীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। রাজধানীর প্রধান রেফারেল হাসপাতাল আগরতলা সরকারি মেডিকেল কলেজ ও জিবি হাসপাতালেও নার্সিং কর্মীর ঘাটতি প্রকট।

আগরতলা || রাজ্যের সরকারি হাসপাতালগুলিতে রোগীর ভিড় বাড়ছে, চিকিৎসার পরিকাঠামো সম্প্রসারণের কথা শোনা যাচ্ছে, নতুন নতুন স্বাস্থ্য পরিষেবার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সেই পরিষেবা বাস্তবে পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ নার্সিং ব্যবস্থার ছবিটা ক্রমশ ভয়াবহ হয়ে উঠছে। হাসপাতালে রোগী আছে, চিকিৎসক আছেন, চিকিৎসার পরিকাঠামোও রয়েছে, অথচ প্রয়োজনের তুলনায় নার্স নেই।
কোথাও একজন নার্সকে সামলাতে হচ্ছে অস্বাভাবিক সংখ্যক রোগী, কোথাও আবার পর্যাপ্ত নার্সিং কর্মীর অভাবে ব্যাহত হচ্ছে নিয়মিত পরিষেবা। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয়, রাজ্যে একদিকে নার্সের তীব্র সঙ্কট, অন্যদিকে সরকারি ও বেসরকারি নার্সিং প্রতিষ্ঠান থেকে পাশ করে বেরিয়ে আসা হাজার হাজার প্রশিক্ষিত যুবক-যুবতী চাকরির অপেক্ষায় দিন গুনছেন। এই বৈপরীত্যের দায় নেবে কে ? স্বাস্থ্য পরিষেবার এমন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় নিয়োগের প্রশ্নে রাজ্য সরকারের নীরবতা কি আদৌ গ্রহণযোগ্য ?
অভিযোগ, গত সাত-আট বছর ধরে রাজ্যে নিয়মিত নার্স নিয়োগ কার্যত বন্ধ। অথচ রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পরিধি ও রোগীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। রাজধানীর প্রধান রেফারেল হাসপাতাল আগরতলা সরকারি মেডিকেল কলেজ ও জিবি হাসপাতালেও নার্সিং কর্মীর ঘাটতি প্রকট। রোগীর অনুপাতে যত সংখ্যক নার্সিং পার্সন থাকার কথা, বাস্তবে তার অর্ধেকও নেই বলে অভিযোগ উঠছে। ফলে চিকিৎসকরা চিকিৎসার দায়িত্ব পালন করলেও রোগীর সার্বক্ষণিক পরিচর্যা, ওষুধ প্রদান, শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ এবং জরুরি মুহূর্তে দ্রুত সাড়া দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলি সামলাতে গিয়ে নার্সদের উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে রোগী পরিষেবায়। একজন অসুস্থ মানুষের কাছে চিকিৎসকের পাশাপাশি নার্সের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা নতুন করে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই। অথচ সেই নার্সিং ব্যবস্থাকেই কার্যত অবহেলার মুখে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ উঠছে। পিছনের ঘটনাপ্রবাহ আরও উদ্বেগজনক।
২০১৬ সালে স্বাস্থ্য দপ্তর প্রায় ৭৮৭টি নার্সিং পদে নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করেছিল। কিন্তু ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সেই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হয়নি। এরপর ২০১৮ সালে নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে নতুন নিয়োগনীতি তৈরির কথা ঘোষণা করে। অন্যান্য নিয়োগ প্রক্রিয়ার পাশাপাশি নার্সিং পার্সন নিয়োগের চলমান প্রক্রিয়াটিও বাতিল হয়ে যায়। তারপর থেকে নিয়মিত সরাসরি নিয়োগের অপেক্ষা যেন দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তায় পরিণত হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, যে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, তার পরিণতি কী হলো ? কেন সেটি সম্পূর্ণ করা গেল না ? নতুন নিয়োগনীতি তৈরি হলে তার সুফল নার্সিং পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে আজও দৃশ্যমান হচ্ছে না কেন ? করোনা অতিমারির সময় অবশ্য জাতীয় স্বাস্থ্য মিশনের উদ্যোগে এগারো মাসের চুক্তির ভিত্তিতে কিছু নার্স নিয়োগ করা হয়েছিল। তাঁদের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হলে নিয়মিত নিয়োগের ব্যবস্থা করা হবে। কিন্তু সেই আশ্বাস বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের চাকরির নিরাপত্তা নেই, নিয়মিতকরণের নিশ্চয়তাও নেই। অর্থাৎ যে কর্মীরা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য পরিষেবা সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন, তাঁদের ভবিষ্যৎও অনিশ্চয়তার মধ্যে। একদিকে স্থায়ী কর্মীর অভাব, অন্যদিকে চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের অনিশ্চিত কর্মজীবন—এই দ্বিমুখী সঙ্কট স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভিতকেই দুর্বল করছে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পরিসংখ্যান হলো, রাজ্যে বিভিন্ন নার্সিং কোর্স উত্তীর্ণ প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার থেকে ছয় হাজার বেকার যুবক-যুবতী রয়েছেন বলে জানা যাচ্ছে। অর্থাৎ প্রশিক্ষিত মানবসম্পদের অভাব নেই, অভাব রয়েছে কার্যকর নিয়োগ উদ্যোগের। অন্যদিকে কর্মরত নার্সদের একটা বড় অংশ বয়সের কারণে অবসরে যাচ্ছেন। শুধু গত ছয় মাসে জিবি হাসপাতাল থেকেই প্রায় ২০ থেকে ২৫ জন নার্স অবসর নিয়েছেন বলে জানা গেছে।
ফলে শূন্যপদের সংখ্যা আরও বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে নিয়োগ না হলে আগামী দিনে হাসপাতালগুলির পরিষেবা সামলানো আরও কঠিন হয়ে পড়বে, এমন আশঙ্কা অমূলক নয়। সংকট শুধু রাজধানীর বড় হাসপাতালেই সীমাবদ্ধ নেই। জেলা হাসপাতাল, মহকুমা হাসপাতাল এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রেও নার্সিং কর্মীর ঘাটতির অভিযোগ উঠছে। কোথাও চিকিৎসক থাকলেও প্রয়োজনীয় নার্সিং কর্মী নেই। ফলে রোগীদের পরিচর্যা, প্রসূতি পরিষেবা, জরুরি চিকিৎসা এবং দৈনন্দিন স্বাস্থ্য পরিষেবা পরিচালনায় সমস্যা তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত এলাকার স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলিতে পর্যাপ্ত নার্স না থাকলে সাধারণ মানুষকেই বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হয়। চিকিৎসার সুযোগ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার যে লক্ষ্য নিয়ে স্বাস্থ্য পরিকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে, পর্যাপ্ত নার্সিং কর্মী ছাড়া সেই লক্ষ্য পূরণ কীভাবে সম্ভব ?
এদিকে চাকরির দাবিতে বেকার নার্সদের আন্দোলনও ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। নিয়মিত স্টাফ নার্স, এএনএম এবং এপিডব্লিউ পদে নিয়োগের দাবিতে স্বাস্থ্য অধিকর্তার কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন চাকরিপ্রার্থীরা। তাঁদের বক্তব্য, বছরের পর বছর প্রশিক্ষণ নিয়েও চাকরি না পেয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে। সরকারি চাকরির আশায় নার্সিং কোর্সে ভর্তি হওয়া বহু পরিবারের কাছে এখন সেই স্বপ্ন হতাশায় পরিণত হচ্ছে। এখানেই রাজ্য সরকারের নীতিগত অবস্থান নিয়ে বড় প্রশ্ন। প্রত্যেক বছর সরকারি উদ্যোগে নার্সিং কোর্সে পড়াশোনার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা অর্থ, সময় এবং পরিশ্রম বিনিয়োগ করে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। কিন্তু প্রশিক্ষণ শেষে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা কোথায় ? সরকার যদি প্রয়োজনীয় নার্সিং কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনাই বাস্তবায়ন না করে, তাহলে প্রতিবছর নতুন করে প্রশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়িয়ে লাভ কী ?
নার্সিং শিক্ষা এবং সরকারি নিয়োগের মধ্যে কোনও দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত পরিকল্পনা রয়েছে কি না, সেটিও এখন স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। রাজ্য মন্ত্রিসভার বিভিন্ন বৈঠকে একাধিক দপ্তরে নিয়োগের সিদ্ধান্ত উঠে এলেও স্বাস্থ্য দপ্তরের নার্সিং অফিসার পদে নিয়োগ নিয়ে দৃশ্যমান সিদ্ধান্তের অভাব হতাশা বাড়াচ্ছে। অথচ স্বাস্থ্য পরিষেবা কোনও বিলাসিতা নয়, এটি মানুষের মৌলিক প্রয়োজনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। প্রয়োজনীয় সংখ্যক নার্স নিয়োগ, হাসপাতালভিত্তিক শূন্যপদের তালিকা প্রকাশ, অবসরজনিত শূন্যপদ পূরণ, চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে স্পষ্ট নীতি এবং নিয়মিত নিয়োগের সময়সীমা ঘোষণা—এখন সময়ের দাবি। শেষ কথা হলো, হাসপাতালের ভবন বড় করে, নতুন যন্ত্রপাতি বসিয়ে কিংবা উন্নয়নের বিজ্ঞাপন দিয়ে স্বাস্থ্য পরিষেবার সাফল্য প্রমাণ করা যায় না। রোগীর পাশে প্রয়োজনের মুহূর্তে একজন প্রশিক্ষিত নার্স উপস্থিত থাকছেন কি না, সেটাই প্রকৃত স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর পরীক্ষা।
একদিকে ছয় হাজারের কাছাকাছি প্রশিক্ষিত বেকার নার্স, অন্যদিকে হাসপাতালগুলিতে কর্মীর অভাবে পরিষেবা ব্যাহত—এর চেয়ে বড় প্রশাসনিক বৈপরীত্য আর কী হতে পারে ? সরকারকে স্পষ্ট করতে হবে, নার্স নিয়োগের ক্ষেত্রে বাধাটা কোথায় এবং কবে এই সঙ্কটের সমাধান হবে। কারণ বেকার নার্সদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলার পাশাপাশি রোগীদের জীবন ও পরিষেবার মান নিয়েও আপস করা যায় না। মনে রাখতে হবে, হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থায় নার্স কোনও অতিরিক্ত কর্মী নন, তাঁরা স্বাস্থ্য পরিষেবার মেরুদণ্ড। আর সেই মেরুদণ্ড দুর্বল রেখে উন্নত স্বাস্থ্য ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখানো মানে জনগণের সঙ্গে প্রতারণারই নামান্তর!