Pratibadi KalamPratibadi Kalam
ব্রেকিংপ্রথম পাতা

ফ্রি সুজি বণ্টনের ঘোষণায় APL বাদ! ৬৫ মেট্রিক টন সুজির হিসাব গায়েব, সরকারি বরাদ্দের টাকার গন্তব্য কোথায়

উৎসবের মরশুমে সাধারণ মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে বিনামূল্যে চিনি, ময়দা ও সুজি দেওয়ার ঘোষণা করেছিল ত্রিপুরা সরকার। কিন্তু সেই ঘোষণার বাস্তবায়ন ঘিরেই এবার সামনে আসছে একাধিক প্রশ্ন। বিশেষ করে বিনামূল্যে ৫০০ গ্রাম সুজি বণ্টনের ক্ষেত্রে APL রেশন কার্ডধারীদের বাদ দেওয়ার অভিযোগ ঘিরে তৈরি হয়েছে বিতর্ক।

Pratibadi Kalam Newsroom4 মিনিট পড়া
ফ্রি সুজি বণ্টনের ঘোষণায়  APL বাদ! ৬৫ মেট্রিক টন সুজির হিসাব গায়েব, সরকারি বরাদ্দের টাকার গন্তব্য কোথায়

উৎসবের মরশুমে সাধারণ মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে বিনামূল্যে চিনি, ময়দা ও সুজি দেওয়ার ঘোষণা করেছিল ত্রিপুরা সরকার। কিন্তু সেই ঘোষণার বাস্তবায়ন ঘিরেই এবার সামনে আসছে একাধিক প্রশ্ন। বিশেষ করে বিনামূল্যে ৫০০ গ্রাম সুজি বণ্টনের ক্ষেত্রে APL রেশন কার্ডধারীদের বাদ দেওয়ার অভিযোগ ঘিরে তৈরি হয়েছে বিতর্ক।

খাদ্যমন্ত্রীর ঘোষণায় ৯.৯২ লক্ষ রেশন কার্ড হোল্ডারদের অর্থাৎ এপিএল ও বিপিএল সকলকেই ঐ সামগ্রী ফ্রি প্রদান করার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু রেশন দোকান থেকে ঐ ঘোষণা এপিএল রেশন কার্ড হোল্ডারদের অনুযায়ী দুই কেজি ময়দা ও এক কেজি চিনি প্রদান করা হলেও ৫০০ গ্রাম ফ্রি সুজি প্রদান করা হচ্ছে। রেশন দোকান মালিকদের স্পষ্ট বক্তব্য ঐ ফ্রি ৫০০ গ্রাম সুজি শুধুমাত্র বিপিএল রেশন কার্ড হোল্ডারদের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে, সুতরাং এপিএল রেশন কার্ড হোল্ডারা ঐ ফ্রি ৫০০ গ্রাম সুজি পাবেন না।

রাজ্যে APL কার্ডধারীর সংখ্যা ৩.৭৫ লাখের উপরে। এতে এপিএল রেশন কার্ড হোল্ডারের ৫০০ গ্রাম ফ্রি সুজি না দেওয়ার ফলে বিশাল পরিমাণ সুজি কম লাগছে, সেই অব্যবহৃত সুজি কোথায় গেল ? তার আর্থিক মূল্যই বা কত ? গোটা বিষয়টির জনসমক্ষে প্রকাশের দাবি উঠছে। গত ৭ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে দুর্গাপূজা উপলক্ষে রাজ্যের ৯ লক্ষ ৯২ হাজার রেশন উপভোক্তাকে বিনামূল্যে চিনি, ময়দা ও সুজি দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছিল। খাদ্যমন্ত্রী সুশান্ত চৌধুরী জানিয়েছিলেন, প্রত্যেক রেশন কার্ডধারীকে এক কেজি চিনি, দুই কেজি ময়দা এবং ৫০০ গ্রাম সুজি দেওয়া হবে।

বিজ্ঞপ্তিতে মোট ২৪৩ মেট্রিক টন সুজি, ১,৯৮৪ মেট্রিক টন ময়দা এবং ৯৯২ মেট্রিক টন চিনি বিতরণের উল্লেখ ছিল। এই প্রকল্পে রাজ্য সরকারের আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৯ কোটি ৩৫ লক্ষ থেকে ৯ কোটি ৮৫ লক্ষ টাকা। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, বিনামূল্যে সুজি দেওয়ার ক্ষেত্রে APL রেশন কার্ডধারীরা সুবিধা পাচ্ছেন না। পশ্চিম ত্রিপুরা জেলা প্রশাসনের ২৭ অক্টোবরের বিজ্ঞপ্তি-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, AAY ও PHH শ্রেণির NFSA উপভোক্তারা ৫০০ গ্রাম সুজি পাবেন।

APL কার্ডধারীরা এই সুবিধার আওতায় নেই। এখানেই উঠছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ৭ অক্টোবরের সংবাদ সম্মেলনে প্রত্যেক রেশন কার্ডধারীকে সুজি দেওয়ার কথা বলা হলেও APL কার্ডধারীদের বাদ দেওয়ার বিষয়টি সাধারণ মানুষের কাছে কতটা স্পষ্ট করা হয়েছিল ? প্রাথমিক ঘোষণা এবং পরবর্তী বণ্টন নির্দেশিকার মধ্যে এই পার্থক্য তৈরি হলে তার ব্যাখ্যা দেওয়া কি সরকারের দায়িত্ব নয় ? রাজ্যের রেশন ব্যবস্থার পরিসংখ্যানও এই প্রশ্নকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। ২০২৬ সালের জুলাই মাসের খাদ্য দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ত্রিপুরায় মোট রেশন কার্ডের সংখ্যা ছিল ৯ লক্ষ ৯০ হাজার ৭৭১টি। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় NFSA-র ড্যাশবোর্ডে AAY কার্ড ১ লক্ষ ১১ হাজার ৩৫৯টি এবং PHH কার্ড ৪ লক্ষ ৯০ হাজার ৮৫০টি দেখানো হয়েছে।

অর্থাৎ এই দুই শ্রেণি মিলিয়ে ৬ লক্ষ ২ হাজার ২০৯টি কার্ড। মোট রেশন কার্ডের সঙ্গে এই সংখ্যার ব্যবধান ৩ লক্ষ ৮৮ হাজার ৫৬২টি। অভিযোগ APL কার্ডধারীদের বাদ দেওয়ার ফলে ঘোষিত পরিমাণের তুলনায় প্রায় ৬৫ মেট্রিক টন সুজি কম প্রয়োজন হচ্ছে। ৬৫ মেট্রিক টন অর্থাৎ ৬৫ হাজার কেজি। এখন প্রশ্ন, ৬৫ মেট্রিক টন সুজি কম প্রয়োজন হয়েছে, তাহলে সেই সুজির বরাদ্দ, ক্রয়মূল্য ও অবশিষ্ট মজুতের হিসাব কোথায় ? সুজি কেনার জন্য কত টাকা ব্যয় করা হয়েছে ? কত পরিমাণ সুজি রাজ্যে এসেছে ? কতটা রেশন দোকানে পাঠানো হয়েছে ? কতটা উপভোক্তাদের মধ্যে বিতরণ হয়েছে ? আর অবশিষ্ট থাকলে তা কোন সরকারি গুদামে মজুত রয়েছে ? আর্থিক দিক থেকেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

প্রতি কেজির ক্রয়মূল্য ৫০ টাকা হলে ৬৫ মেট্রিক টনের মূল্য দাঁড়ায় ৩২ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা। উৎসবের সময় সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই ঘোষণার সঙ্গে বাস্তব বণ্টনের সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন। বিশেষ করে APL কার্ডধারীদের সুজি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত এবং বরাদ্দের পরিমাণ নিয়ে যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, তার জবাব তথ্যসহ সরকারকেই দিতে হবে। সবশেষে প্রশ্ন একটাই—২৪৩ মেট্রিক টন সুজি বরাদ্দের ঘোষণা, APL কার্ডধারীদের বাদ দেওয়া এবং ৬৫ মেট্রিক টন কম প্রয়োজন হওয়ার অভিযোগের মধ্যে প্রকৃত হিসাবটি কোথায় ?

অব্যবহৃত সুজি সরকারি গুদামে রয়েছে, অন্য কোনও খাতে বরাদ্দ হয়েছে, নাকি ক্রয়ই করা হয়নি ? সরকারি অর্থ ও খাদ্যসামগ্রীর হিসাবের প্রকূত তথ্য প্রকাশের দায় কোন ভাবেই এড়াতে পারেবেনা রাজ্য প্রশাসন। এই পরিস্থিতিতে রাজ্যের সকল এপিএল রেশন কার্ড হোল্ডারদের খাদ্য দপ্তরের কাছে দাবি, রেশন কার্ডের শ্রেণিভিত্তিক সংখ্যা, সুজি ক্রয়ের পরিমাণ, প্রকৃত ক্রয়মূল্য, বরাদ্দ ও বিতরণের পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ করা হোক। কারণ সরকারি বরাদ্দের এক কেজি সুজির হিসাবও জনগণের জানার অধিকারভুক্ত।