Pratibadi KalamPratibadi Kalam
প্রথম পাতা

বোর্ডহীন ১৩৭ হেক্টরের লীলাগড় চাবাগানে উৎপাদন ও আর্থিক বিশূঙ্খলতা

বোর্ডহীন ১৩৭ হেক্টরের লীলাগড় চাবাগানে উৎপাদন ও আর্থিক বিশূঙ্খলতা

Pratibadi Kalam Newsroom4 মিনিট পড়া
বোর্ডহীন ১৩৭ হেক্টরের লীলাগড় চাবাগানে উৎপাদন ও আর্থিক বিশূঙ্খলতা

দক্ষিণ ত্রিপুরা জেলার সাব্রুম মহকুমার বিজয়নগর এলাকায় অবস্থিত লীলাগড় চা বাগানকে ঘিরে প্রশাসনিক সংকট ক্রমেই গভীর হচ্ছে। একদিকে বিস্তীর্ণ চা বাগান, উৎপাদনের সম্ভাবনা ও কয়েকশো শ্রমিকের কর্মসংস্থান, অন্যদিকে পরিচালন পর্ষদের পদত্যাগ, নতুন বোর্ড গঠনে দীর্ঘসূত্রিতা, আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন এবং উৎপাদন প্রক্রিয়ায় সমস্যার অভিযোগ—সব মিলিয়ে লীলাগড়ের পরিস্থিতি এখন নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে। চা শিল্পের সঙ্গে যুক্ত একটি শ্রমিক সমবায়ের পরিচালন ব্যবস্থায় এমন অচলাবস্থার অভিযোগ সামনে আসায় প্রশ্ন উঠছে, বাগানের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কোন পথে এগোচ্ছে ? যে প্রতিষ্ঠান শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে, তার পরিচালন ব্যবস্থার অনিশ্চয়তার প্রভাব কতটা বিস্তৃত হতে পারে, তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। সংশ্লিষ্ট বাগান সূত্রে জানা গেছে, লীলাগড় চা বাগান পরিচালিত হয় ‘লীলাগড় চা বাগান শ্রমিক সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর অধীনে। সমিতির নিবন্ধন নম্বর ৩০৮। বাগানের মোট জমির পরিমাণ ১৩৭.৪০ হেক্টর। সম্প্রতি আরও ৩৫ হেক্টর জমিতে চা বাগান সম্প্রসারণ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। সূত্রের মতে, বর্তমানে উৎপাদনযোগ্য জমির পরিমাণ প্রায় ১১০.১৫ হেক্টর। অর্থাৎ, জমির পরিমাণ ও উৎপাদনের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাগানের বর্তমান পরিচালন পরিস্থিতি নিয়ে তৈরি হয়েছে একাধিক প্রশ্ন। একসময় উন্নত মানের চা উৎপাদন এবং বাজারে ভালো চাহিদার কারণে লীলাগড় রাজ্যের চা শিল্পে উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করেছিল বলে জানা যায়। সেই সাফল্যের সঙ্গে শ্রমিকদের আর্থিক স্বার্থও জড়িয়ে ছিল। অথচ বর্তমানে প্রশাসনিক ও আর্থিক সংকটের অভিযোগ সেই প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ নিয়েই উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। বর্তমানে বাগানে প্রায় ৩০০ জন স্থায়ী শ্রমিক রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১১ জন অফিসকর্মী। এ ছাড়া ৪২ জন কর্মী প্রভিডেন্ট ফান্ডের আওতায় রয়েছেন বলে জানা গেছে। এই কর্মীবাহিনীর জীবিকা, বাগানের উৎপাদন এবং সমবায়ের আর্থিক স্থিতিশীলতা—সবই পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে পরিচালন ব্যবস্থায় দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা তৈরি হলে তার প্রভাব কেবল প্রশাসনিক নথিপত্রে সীমাবদ্ধ থাকবে না; কর্মপরিকল্পনা, উৎপাদনের ধারাবাহিকতা না থাকায় এবং শ্রমিকদের আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়টি এখন প্রশ্নের মুখে। উৎপাদন কমার ফলে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে বলে খবর। গত কয়েক বছর ধরে বাগানের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে কর্মীদের একাংশের কর্মসংস্কৃতি এবং যথাযথ নজরদারির ঘাটতি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে বলে জানা গেছে। অভিযোগ, এসব সমস্যার কারণে চা উৎপাদনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে এবং উন্নত মানের চা উৎপাদনের ক্ষেত্রে বাধা তৈরি হচ্ছে। অভিযোগগুলির সুনির্দিষ্ট ভিত্তি, আর্থিক হিসাবের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ এবং উৎপাদন পরিস্থিতির পরিসংখ্যান প্রকাশ্যে স্পষ্ট না হওয়ায় সন্দেহের মাত্রা দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে অভিযোগ, কর্মীদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন এবং প্রশাসনিক নজরদারির ঘাটতির দাবি—এই তিনটি বিষয়ই এখন বাগানের সংকটের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে খবর।‌ পরিস্থিতির মোড় ঘোরে লীলাগড় চা বাগান শ্রমিক সমবায় সমিতির নয় সদস্যের বোর্ড অব ডিরেক্টরস একযোগে পদত্যাগ করার পর। বোর্ডের সভাপতি ছিলেন কল্পনা রায় এবং সম্পাদক ছিলেন লক্ষ্মণ সিং। কিন্তু কী কারণে নয় সদস্য একসঙ্গে পদত্যাগ করেছিলেন, সে বিষয়ে এখনও স্পষ্ট নয়। এই পদত্যাগের পর সমবায়ের নিয়মিত পরিচালন কাঠামো ভেঙে পড়ে বলে অভিযোগ। এরপর মহকুমা সমবায় দপ্তর বাগান পরিচালনার জন্য প্রশাসক নিয়োগ করে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, হীরালাল দাস ৯ মে ২০২৬ তারিখে প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরে তিনি বাগানের কর্মী জীবন রায়ের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি পরিচালন কমিটি গঠন করেন। কিন্তু প্রশাসক নিয়োগ ও পরিচালন কমিটি গঠনের পরও পরিস্থিতি প্রত্যাশিতভাবে স্বাভাবিক হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার ঘাটতির কারণে কমিটি বাগান পরিচালনায় কাঙ্ক্ষিত সাফল্য দেখাতে পারেনি বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে এই মূল্যায়নের পক্ষে নির্দিষ্ট নথি বা কর্মসম্পাদনের পরিসংখ্যান এখনও স্পষ্ট নয়। প্রশাসক দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে উৎপাদন, আয়-ব্যয়, কর্মী ব্যবস্থাপনা এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে কী পরিবর্তন এসেছে, সেই হিসাবও বর্তমান বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শুধু প্রশাসক নিয়োগ করলেই যে দীর্ঘদিনের পরিচালন সংকট মিটে যায়, লীলাগড়ের পরিস্থিতি সেই প্রশ্নই সামনে আনছে। সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে নতুন পরিচালন পর্ষদের নির্বাচন ঘিরে। অভিযোগ, বোর্ডের সদস্যরা পদত্যাগ করার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও নতুন বোর্ড গঠনের জন্য নির্বাচন হয়নি। সমবায়ের প্রযোজ্য বিধি অনুযায়ী, পদত্যাগের পর ৬০ দিনের মধ্যে নির্বাচন হওয়ার কথা বলে দাবি উঠেছে। সেই সময়সীমা অতিক্রান্ত হওয়ার পরও নির্বাচন না হওয়ায় সমবায় দপ্তরের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা। শ্রমিকদের একাংশের অভিযোগ, নির্বাচিত পরিচালন পর্ষদ না থাকায় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, আর্থিক পরিকল্পনা এবং শ্রমিকদের সমস্যা সমাধানে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। লীলাগড় চা বাগানের সংকট তাই কেবল একটি পরিচালন পর্ষদের পদত্যাগ কিংবা প্রশাসক নিয়োগের ঘটনা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ১৩৭.৪০ হেক্টর জমির চা বাগান, উৎপাদনযোগ্য জমির ব্যবহার, আর্থিক হিসাবের স্বচ্ছতা, প্রায় ৩০০ স্থায়ী শ্রমিকের কর্মসংস্থান এবং সমবায়ের ভবিষ্যৎ পরিচালন কাঠামো। অভিযোগগুলির সত্যতা, আর্থিক ব্যবস্থাপনার প্রকৃত অবস্থা এবং নির্বাচন না হওয়ার কারণ—প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে ঐ বাগানে কর্মরত কয়েকশো কর্মচারীর ভবিষ্যৎ। লীলাগড়ের চা গাছের সারি আজও উৎপাদনের সম্ভাবনার কথা বললেও, বাগানের পরিচালন ব্যবস্থা ঘিরে জমতে থাকা অভিযোগ সেই সম্ভাবনার উপরই অনিশ্চয়তার ছায়া ফেলছে। নয় সদস্যের পদত্যাগ কেন, নির্বাচন কোথায় আটকে, আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওঠা প্রশ্নের জবাব কী—এসবের স্পষ্ট উত্তর না মিললে সংকটের গভীরতা নিয়ে বিতর্ক থামার নয়। শ্রমিক সমবায়ের বাগানে শ্রমিকদের স্বার্থই যদি পরিচালন ব্যবস্থার কেন্দ্রে থাকার কথা হয়, তাহলে লীলাগড়ের বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।