ভোটার তালিকার বিষয়, চাপা দিচ্ছে চিকেন রোল
কিন্তু সেই আলোচনায় যুক্তি, সহনশীলতা এবং সংবিধান যে ব্যক্তি স্বাধীনতার অধিকার দিয়েছে, তার জায়গাটাও থাকতে হবে৷ আর একই সঙ্গে, কোনও বিষয় যে আসল প্রশ্ণ থেকে মানুষের নজর সরিয়ে দিচ্ছে, সেটাও চিনতে পারার ক্ষমতা গণতন্ত্রের থাকা দরকার৷

প্রতিবাদী কলম প্রতিনিধি, নয়াদিল্লি, ৬ অক্টোবর৷৷ ভোটার তালিকা ও নির্বাচন কমিশন নিয়ে প্রতিবাদ গড়িয়ে গেল রাহুল গান্ধীর খাবারে৷ ‘গড়িয়ে গেল’ নয়, গড়িয়ে দেওয়া হল প্রচারে৷ সংবিধান, ব্যক্তিগত পছন্দ ও রাজনৈতিক ভাবে মানুষের নজর অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার বৃহত্তর নকশার অংশই এই জিনিস৷ ভারতের রাজনীতিতে যেন আর কিছু নেই, আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে একটি চিকেন রোল৷ দিল্লিতে বিরোধীদের প্রতিবাদের সভায় রাহুল গান্ধী কেন চিকেন রোল খেলেন, আর খেলেন যখন, তখন তার যেন আর কথা বলার অধিকার রইল না৷ বিষয়টিকে দাঁড় করানো হল, ধর্ম বিচ্যুতির৷ ভোটার তালিকা, জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি, সবকিছুর জবাব, রাহুল চিকেন রোল খান পিতৃপক্ষে! নির্বাচন কমিশনের দফতরে যেতে চেয়েছিলেন রাহুল গান্ধী ও ইন্ডিয়া জোটের অন্য নেতারা৷ পুলিশ তাদের আটকে দেয়৷ সেই সময় কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী চিকেন রোল খাচ্ছিলেন এমন অভিযোগ করে ‘প্রচার’৷ অথচ প্রতিবাদের আসল বিষয় ছিল একেবারেই অন্য৷ ভোটার তালিকার কাজকর্ম, ভোটার তালিকার স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি নিয়েই নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন বিরোধী নেতারা৷ মিছিলের সময় পুলিশ তাদের আটকে দেয়৷ তাদের মধ্যে ছিলেন রাহুল গান্ধী৷ রাজনৈতিক আলোচনা এখন ভোটার তালিকা থেকে সরে গিয়ে রাহুল গান্ধীর প্লেটে কী ছিল, সেই প্রশ্ণে আটকে গেছে৷ সমালোচকদের প্রশ্ণ, পিতৃপক্ষের সময় এবং মঙ্গলবারে আমিষ খাবার খাওয়া কতটা ঠিক৷ কারণ, বহু হিন্দু পরিবারে এই সময় এবং মঙ্গলবারে মাংস খাওয়া হয় না৷ কে কী খাবেন, সেটা তার ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও পছন্দের বিষয়৷ কেউ নিজের ইচ্ছায় কোনও ধর্মীয় নিয়ম মানতেই পারেন৷ কিন্তু তিনি যে নিয়ম মানছেন, সেই নিয়ম অন্য সবাইকেও মানতে হবে এমনটা নয়৷ সংবিধান মেনে চলা গণতন্ত্রে এই পার্থক্যটা খুব গুরুত্বপূর্ণ৷ সংবিধান কী বলছে? ভারতের সংবিধান কোনও জাতির খাদ্যাভ্যাস ঠিক করে দেয়নি৷ সংবিধান মানুষের বিবেকের স্বাধীনতা এবং ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচরণের অধিকারকে সুরক্ষা দেয়৷ একই সঙ্গে সুরক্ষা দেয় ব্যক্তি স্বাধীনতাকেও৷ সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন রায়ে সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে৷ ২০১৭ সালের গোপনীয়তার অধিকার সংক্রান্ত রায়ে আদালত নিজের পছন্দের খাবার বেছে নেওয়ার বিষয়টিকেও ব্যক্তিস্বাধীনতার অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছিল৷ বিষয়টি শুধু তাত্ত্বিক নয়৷ হিংসা বিরোধক সংঘ বনাম মির্জাপুর মোতি কুরেশ জামাত মামলায় সুপ্রিম কোর্ট বলেছিল, একজন মানুষ কী খাবেন, সেটা তার ব্যক্তিগত বিষয়৷ তার সাথে সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকারের সম্পর্ক আছে৷ ভারতের মানুষের খাবারের অভ্যাস যে এক নয়, সেই বাস্তবতাও আদালত স্বীকার করেছিল৷ শুধু আমিষ খাবার খান বলে কাউকে জোর করে নিরামিষভোজী বানিয়ে দেওয়া যায় না আদালতের রায়ে সেই কথাও উঠে এসেছিল৷ অবশ্য তার মানে এই নয় যে খাবারের ব্যাপারে ব্যক্তিস্বাধীনতা মানেই যা খুশি করার অধিকার৷ জনস্বাস্থ্য, খাদ্যের নিরাপত্তা ও সংবিধানসম্মত অন্য কোনও কারণে সরকার খাবার নিয়ে নির্দিষ্ট নিয়ম করতে পারে৷ ধর্মীয় অনুভূতির কথা মাথায় রেখে বিশেষ পরিস্থিতিতে কসাইখানা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার মতো সীমিত বিধিনিষেধও সুপ্রিম কোর্ট বহাল রেখেছে৷ কিন্তু অন্যের ধর্মীয় আচরণকে সম্মান করা অথবা কোনও আচরণ সবার উপর চাপিয়ে দেওয়া দুটো এক বিষয় নয়৷ কেউ পিতৃপক্ষের সময় মাংস খাবেন না, সেটা তার নিজের বিশ্বাস ও সিদ্ধান্ত৷ কিন্তু সেই নিয়ম অন্য একজনকে মানতেই হবে, এমন কোনও কথা নেই৷ এই বিতর্কের আরও চিন্তার বিষয় হল, চিকেন রোল খাওয়ার মতো একটি ঘটনা দিয়ে কারও ধর্মীয় পরিচয় প্রমাণ বা অপ্রমাণ করার চেষ্টা৷ ব্যক্তিস্বাধীনতা ও নিজের বিবেক অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার যেখানে সংবিধান স্বীকার করে, সেখানে এমন ধারণার জায়গা খুবই কম৷ সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদ মানুষের বিবেকের স্বাধীনতা ও নিজের ধর্ম বিশ্বাস, পালন ও প্রচারের অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে৷ অবশ্যই এই অধিকার সংবিধানের নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে৷ অর্থাৎ সংবিধান বলছে, একজন মানুষ নিজের বিশ্বাস অনুযায়ী ধর্ম পালন করতে পারবেন৷ কিন্তু প্রত্যেক নাগরিককে অন্যের ধর্মীয় রীতিনীতি মেনেই চলতে হবে এমন কোনও কথা নেই৷ খাবার কিংবা ধর্মীয় অনুভূতির মতো বিষয়ে সহনশীলতার গুরুত্ব সুপ্রিম কোর্টও বারবার বলেছে৷ ২০১৫ সালে জৈন ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সময় মাংসের উপর বিধিনিষেধ সংক্রান্ত একটি মামলায় আদালত সহনশীলতার গুরুত্বের কথা বলেছিল৷ অন্যের উপর নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস চাপিয়ে দেওয়ার বদলে সহনশীলতার প্রয়োজনীয়তাই সেখানে গুরুত্ব পেয়েছিল৷ এই নীতিটা দু’দিক থেকেই প্রযোজ্য৷ কেউ মাংস না খেলে তাকে নিয়ে ঠাট্টা করা উচিত নয়৷ একইভাবে, কেউ সেই নিয়ম না মানলে তাকেও নৈতিক বা সাংসৃকতিক ভাবে অগ্রহণযোগ্য বলে দাগিয়ে দেওয়া যায় না৷ বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির জায়গা কোথায়? সংবিধানের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রায় দেখাই যাচ্ছে না বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি৷ সংবিধানের ৫১এ(এইচ) অনুচ্ছেদে নাগরিকদের বৈজ্ঞানিক মানসিকতা, মানবিকতা এবং প্রশ্ণ করা ও সংস্কারের মানসিকতা গড়ে তোলাকে মৌলিক কর্তব্য বলা হয়েছে৷ তার মানে ধর্মের কোনও জায়গা নেই, এমন নয়৷ কেউ ধর্মীয় রীতি পালন করতে পারবেন না, এমনও নয়৷ বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির সহজ অর্থ হল বিশ্বাস, ব্যক্তিগত ধারণা এবং সাংসৃকতিক রীতির সঙ্গে প্রমাণিত সত্যের পার্থক্যটা বোঝা৷ চিকেন রোল খেলে কেউ কম দেশপ্রেমিক, কম ভারতীয় বা কম হিন্দু হয়ে যান এমন কোনও বৈজ্ঞানিক সত্য নেই৷ এগুলো রাজনৈতিক মতলবের দাবি হতে পারে, বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত নয়৷ একইভাবে, কেউ পিতৃপক্ষের নিয়ম মানবেন কি না, সেটাও তার বিশ্বাস ও ব্যক্তিগত আচরণের বিষয়৷ সেটাকে কারও চরিত্র যাচাইয়ের বৈজ্ঞানিক মাপকাঠি বানানো যায় না৷ একটি গণতন্ত্রে ধর্মীয় বিশ্বাসের জায়গা থাকতে পারে৷ বিশ্বাসকে বৈজ্ঞানিক সত্য হিসেবে দাঁড় করানো যায় না৷ প্লেটটাই কি এখন রাজনীতির বিষয়? চিকেন রোল নিয়ে বিতর্কটি অন্যভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে৷ মূল রাজনৈতিক প্রশ্ণটি প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে৷ ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে বিরোধীরা প্রশ্ণ তুলছেন৷ নির্বাচন কমিশন দেশের নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে থাকা একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান৷ তাই ভোটার তালিকা নিয়ে প্রশ্ণ আসলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সুস্থিতি, সুস্বাস্থ্য ও তার কাজকর্ম নিয়েই প্রশ্ণ৷ এই প্রশ্ণ নিয়ে আলোচনা হতে পারে৷ প্রশ্ণ তোলা যেতে পারে৷ নির্বাচন কমিশন তার জবাব দিতে পারে৷ রাজনৈতিক দলগুলি যে দাবি করছে, তারও বিচার হতে পারে৷ কিন্তু কোনও রাজনৈতিক নেতা বা কর্মী প্রতিবাদের সময় চিকেন রোল খেয়েছেন কি না, তা দিয়ে ভোটার তালিকা ঠিক আছে কি না, সেই প্রশ্ণের উত্তর পাওয়া যায় না৷ দুটি বিষয় সম্পূর্ণ আলাদা৷ একটি বিষয় সংবিধান, নির্বাচন এবং মানুষের ভোটাধিকার নিয়ে৷ অন্যটি একজন মানুষের দুপুরের খাবার নিয়ে৷ দ্বিতীয় বিষয়টিকে যদি প্রথমটির চেয়ে বড় করে তোলা হয়, তার একটা স্পষ্ট ফল হতে পারে আসল প্রশ্ণটাই আড়ালে চলে যাবে৷ এই কারণেই চিকেন রোল নিয়ে বিতর্ককে শুধু রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ির আর একটি ঘটনা হিসেবে দেখলে বিষয়টির একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক বাদ পড়ে যায়৷ কারণ, কোনও প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে কঠিন প্রশ্ণের মুখোমুখি হলে জনআলোচনাকে পরিচয়, খাবার এবং ব্যক্তিগত আচরণের দিকে ঘুরিয়ে দিয়ে কেটে পড়া সহজ হতে পারে৷ অন্যদিকে নজর ঘোরানো কেন কায়েমী রাজনীতিতে কাজে লাগে রাজনীতিতে প্রতীকী বিষয় ব্যবহার নতুন কিছু নয়৷ ভারতে খাবার বিশেষভাবে শক্তিশালী একটি রাজনৈতিক বিষয়৷ কারণ খাবারের সঙ্গে ধর্ম, জাতপাত, সম্প্রদায় এবং পরিচয়ের সম্পর্ক জড়িয়ে জট পাকানো চলছে বহুদিন ধরেই৷ খাবারকে কেন্দ্র করে খুব সহজেই আবেগে সুড়সুড়ি করা যাচ্ছে৷ ভোটার তালিকা নিয়ে প্রশ্ণ তুলতে গেলে দরকার নথি, সংখ্যা, নিয়ম, প্রক্রিয়া ও প্রমাণ৷ তাকে যুক্তি দিয়ে কাটতেও লাগে তাই৷ কিন্তু চিকেন রোল নিয়ে বিতর্ক তৈরি করতে দরকার শুধু একটি ভিডিও আর অভিযোগ৷ প্রথম বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে সময় লাগে৷ দ্বিতীয়টি কয়েক সেকেন্ডে দেখা যায়, দ্রুত ক্ষোভ তৈরি করে তা ছড়িয়ে দেওয়া যায় প্রচারের জোরে৷ এই পার্থক্যটা গুরুত্বপূর্ণ৷ গণতন্ত্র শুধু ভোট দেওয়ার অধিকারেই শেষ নয়৷ সেই ভোট কী ভাবে পরিচালিত হচ্ছে, সেই প্রশ্ণ নিয়েও নাগরিকদের মনোযোগ ধরে রাখা দরকার৷ যদি নির্বাচনের স্বচ্ছতা এবং ভোটার তালিকার নির্ভুলতা নিয়ে আলোচনা সরে গিয়ে একজন রাজনীতিক মঙ্গলবার চিকেন খেয়েছেন কি না, সেটাই দিনের প্রধান রাজনৈতিক বিতর্ক হয়ে ওঠে, তাহলে তার রাজনৈতিক ফলটা বোঝা কঠিন নয়৷ প্লেটটাই খবর হয়ে যায়৷ তার আড়ালে চলে যায় ভোটার তালিকার প্রশ্ণ৷ আর সেই কারণেই হয়তো এই ধরনের বিতর্ক রাজনীতিতে এতটা কাজে লাগে৷ আসল সাংবিধানিক প্রশ্ণটা এটা নয় যে রাহুল গান্ধীর চিকেন রোল খাওয়া উচিত ছিল কি না৷ কোনও আইন তাকে তা করতে বাধা না দিলে, কী খাবেন সেটা তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত৷ বড় প্রশ্ণ হল, দেশের নির্বাচনি ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় একটি প্রতিষ্ঠান কীভাবে কাজ করছে, তা নিয়ে যখন বিতর্ক চলছে, ঠিক সেই সময় একজন রাজনীতিক কী খেয়েছেন, সেটাই কেন জাতীয় রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে চলে এল? একটি গণতন্ত্রে ধর্ম এবং খাবার নিয়ে আলোচনা করার জায়গা অবশ্যই থাকবে৷ কিন্তু সেই আলোচনায় যুক্তি, সহনশীলতা এবং সংবিধান যে ব্যক্তি স্বাধীনতার অধিকার দিয়েছে, তার জায়গাটাও থাকতে হবে৷ আর একই সঙ্গে, কোনও বিষয় যে আসল প্রশ্ণ থেকে মানুষের নজর সরিয়ে দিচ্ছে, সেটাও চিনতে পারার ক্ষমতা গণতন্ত্রের থাকা দরকার৷