সক্রিয় রাজনীতি ছাড়লাম ঃ চিঠি লিখে ঘোষণা প্রদ্যোত’র
আমি যখন ‘তিপ্রা মথা’ প্রতিষ্ঠা করি, তখন আরও অনেক ছোট দল একই কারণে লড়াই করছিল, কিন্তু আলাদা আলাদাভাবে৷ আমি বিশ্বাস করতাম যে আমাদের শক্তি সবসময়ই সেখানে ছিল আমাদের কেবল ঐক্যের প্রয়োজন ছিল৷ একটি মঞ্চ, একটি স্বর, একটি থানসা৷ আমরা তিপ্রা মথা কেবল একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে গড়ে তুলিনি, বরং আমাদের জনগণকে একত্রিত করার এবং তিপ্রাসাদের কণ্ঠস্বর জোরালো করার একটি আন্দোলন হিসেবে গড়ে তুলেছিলাম৷

প্রতিবাদী কলম প্রতিনিধি, আগরতলা, ৭ অক্টোবর ৷৷ তিপ্রা মথা সুপ্রিমো প্রদ্যোত কিশোর দেববর্মণ ‘অ্যাক্টিভ পলিটিক্স’ ছাড়ার ঘোষণা দিলেন৷ বিষয়টি এর আগে তাঁর কথায় এক-দু’বার প্রসঙ্গক্রমে এলেও, বুধবার তিনি রাজ্যবাসীর উদ্দেশে দু’পাতার চিঠি লিখে ‘রাজনীতি’ ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন৷ প্রদ্যোত এর লেখা চিঠিটি ইংরেজিতে৷ চিঠির আবেগ, শব্দ প্রয়োগ এবং বক্তব্যকে যতটা সম্ভব এক রেখে, নিচে তার বঙ্গানুবাদ করা হলো --- আমার প্রিয় ত্রিপুরাবাসী, আমার জীবনের বেশিরভাগ সময় জুড়ে আমি আমার হৃদয়ে একটি ভাবনা লালন করেছি, তা হলো, আমি যাতে সেই সমস্তটাই করি যাতে ত্রিপুরা এগিয়ে যায় এবং আমাদের সন্তানেরা যেন তাদের প্রাপ্য অধিকার, মর্যাদা এবং সাংবিধানিক সুরক্ষাগুলি উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করে যা অধিকারবশত তাদেরই৷ জনজীবনে আমি যা কিছু করেছি, তা সেই কর্তব্যবোধ থেকেই এসেছে৷ এই যাত্রায় আমাকে অনেক কঠিন মুহূর্তের মুখোমুখি হতে হয়েছে৷ ব্রু চুক্তি বাস্তবায়ন ছিল তেমনই একটি মুহূর্ত, যখন আমরা মর্যাদা, আশা এবং নিজেদের আপন করে নেওয়ার অনুভূতি ফিরিয়ে আনতে পেরেছিলাম হাজার হাজার ভাইবোনেদের মধ্যে৷ তিপ্রাসা চুক্তির জন্য সংগ্রাম ছিলো সেরকম আরেকটি যাত্রাপথ৷ সেই লড়াই ছিল ঐতিহাসিক অন্যায় দূর করে আমাদের জনজাতি জনগণের জন্য একটি নিরাপদ ও আরও মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার লড়াই৷ আমি যখন ‘তিপ্রা মথা’ প্রতিষ্ঠা করি, তখন আরও অনেক ছোট দল একই কারণে লড়াই করছিল, কিন্তু আলাদা আলাদাভাবে৷ আমি বিশ্বাস করতাম যে আমাদের শক্তি সবসময়ই সেখানে ছিল আমাদের কেবল ঐক্যের প্রয়োজন ছিল৷ একটি মঞ্চ, একটি স্বর, একটি থানসা৷ আমরা তিপ্রা মথা কেবল একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে গড়ে তুলিনি, বরং আমাদের জনগণকে একত্রিত করার এবং তিপ্রাসাদের কণ্ঠস্বর জোরালো করার একটি আন্দোলন হিসেবে গড়ে তুলেছিলাম৷ আমরা সমালোচনা, উপহাস এবং অনেক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলাম৷ কিন্তু ধীরে ধীরে পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে শুরু করে৷ আজ আমাদের থানসা সমগ্র ত্রিপুরায় স্বীকৃত এবং উত্তর-পূর্ব ভারতেও সমাদৃত৷ আমরা যখন শুরু করেছিলাম, তখন আমাদের সাথে মাত্র কয়েকজন নেতা ছিলেন৷ আজ যখন আমি সরে দাঁড়াচ্ছি, তখন আমি গভীর কৃতজ্ঞতা নিয়ে পিছন ফিরে দেখছি যে ঃ ৩,৪২৮ জন নির্বাচিত গ্রাম পরিষদ নেতা, ২৪ জন এমডিসি এবং ১৩ জন বিধায়ক রয়েছেন৷ আমাকে এই শিক্ষাতেই বড় করা হয়েছে যে, সুযোগ কোনো প্রাপ্য অধিকার নয়, এটি একটি দায়িত্ব৷ আমার পরিবার আমাকে শিখিয়েছিল যে ইতিহাসের পাতায় আমাদের স্থান অর্জনের কোনো অর্থ নেই, যদি না আমরা তা আমাদের জনগণের সেবায় ব্যবহার করি৷ সেই মূল্যবোধগুলিই আমাকে সারা জীবন ধরে পথ দেখাচ্ছে৷ তবে এই যাত্রার একটি ব্যক্তিগত মূল্যও চোকাতে হয়েছে৷ বছরের পর বছর ধরে ঘোরাঘুরি, পাবলিক লাইফ, দরকষাকষি এবং নিরন্তর সংগ্রাম আমার স্বাস্থ্য, মনের শান্তি এবং ক্ষেত্রবিশেষে আমার পরিবারের ওপরও প্রভাব ফেলেছে৷ ব্যক্তিগতভাবে আমাকে কী মূল্য চুকাতে হচ্ছে, তা প্রায়শই না ভেবে আমি এই কারণগুলির পেছনে নিজের সর্বস্ব ঢেলে দিয়েছি৷ তিপ্রাসা চুক্তিটি বিশেষভাবে কঠিন ছিল৷ এই বিষয়ক নিগোসিয়েশনগুলো আমার শারীরিক ও মানসিক পরীক্ষা নিয়েছে৷ এমন কিছু মুহূর্ত এসেছে যখন আমি গভীরভাবে একাকী বোধ করেছি, কারণ আমি যাদের বিশ্বাস করেছিলাম যে তারা আমাদের বঞ্চিত ও সংগ্রামরত তিপ্রাসা জনগণের বৃহত্তর স্বার্থকে সবকিছু ছাপিয়ে উপরে স্থান দেবেন, তারা পরস্পরবিরোধী স্বার্থ এবং নানা জটিলতার দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিলেন৷ কেউ কেউ আমাকে হতাশ করেছেন৷ কিছু সিদ্ধান্ত আমাদের সম্মিলিত অবস্থানকে দুর্বল করে দিয়েছে৷ এবং সেই দুর্বলতাগুলি এমন ব্যক্তিরা লক্ষ্য করেছেন যারা সর্বদা আমাদের অধিকারের বিরোধিতা করে এসেছেন৷ তবে আমি কোনো তিক্ততা পেছনে রাখতে চাই না৷ কাজ চালিয়ে যেতে হবে৷ তিপ্রাসা চুক্তিটি যেকোনো ব্যক্তি, দল বা রাজনৈতিক পদের চেয়ে অনেক বড়৷ এটি আমাদের জনগণের এবং আগত প্রজন্মের৷ ভারতের মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ত্রিপুরার মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীর দেওয়া আশ্বাস অনুযায়ী তিপ্রাসা চুক্তিটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই বাস্তবায়ন করা উচিত অন্যথায় তা জনগণের বিশ্বাসের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা হবে৷ ব্যক্তিগতভাবে আমার যা-ই ঘটুক না কেন, আমি আন্তরিকভাবে আশা করি যে আমরা সকলেই ঐক্যবদ্ধ থাকব এবং এর প্রতিশ্রুতিগুলি বাস্তবায়িত দেখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হব৷ ক্ষমতা বা পদের মোহে আমি কখনো কোনো রাজনৈতিক চেয়ার চাইনি৷ আমার একমাত্র ইচ্ছা ছিল আমাদের জনগণের জন্য ন্যায়বিচার, মর্যাদা এবং একটি উন্নত ভবিষ্যতের দিকে আমার সাধ্যমতো অবদান রাখা৷ আজ, অনেক চিন্তা-ভাবনা এবং যথেষ্ট যন্ত্রণার পর, আমি একটি স্পষ্ট ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিচ্ছি: আমি সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়াচ্ছি৷ আমি আর কোনো রাজনৈতিক পদ ধরে রাখব না বা দৈনন্দিন রাজনৈতিক কার্যকলাপে অংশগ্রহণ করব না৷ এটি সাময়িক কোনো প্রত্যাহার বা রাগের বশে নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত নয়৷ বছরের পর বছর ধরে সেবা এবং আত্মবিশ্লেষণের পর এটি একটি অত্যন্ত ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত৷ আমি কী পেছনে ফেলে যাচ্ছি তা আমি জানি, এবং ভারী হৃদয়েই আমি এই পদক্ষেপ নিচ্ছি৷ তবে আমি এও জানি যে আমি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছি, যেখানে আমাকে অবশ্যই আমার স্বাস্থ্য, আমার পরিবার এবং আমার নিজের মানসিক শান্তিকে বেছে নিতে হবে৷ আমি পরিবারের সাথে সময় কাটাতে চাই, স্বাস্থ্যের যত্ন নিতে এবং নিজের ভেতরের সেই অংশগুলোকে পুনরুদ্ধার করতে চাই যা আমি বহু বছর ধরে অবহেলা করেছি৷ জনজীবনের দায়িত্ব বহনের দীর্ঘ জীবন কাটানোর পর, আমার এখন একটু শ্বাস নেওয়ার, চিন্তা করার এবং নিরাময় লাভের সময় প্রয়োজন৷ সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর অর্থ এই নয় যে ত্রিপুরা থেকে সরে দাঁড়াচ্ছি৷ আমি আর রাজনৈতিক পদাধিকারী থাকব না, তবে আমি সর্বদা আমাদের জনগণের সাথে যুক্ত থাকব এবং তাদের মর্যাদা, অধিকার ও ভবিষ্যতের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকব৷ এই মাটির এবং এখানকার মানুষের প্রতি আমার ভালোবাসা কখনো আমাকে ছাড়বে না৷ আমার অভিজ্ঞতা, পরামর্শ বা সহায়তা যখনই প্রয়োজন হবে, আমি তখনই হাজির থাকবো৷ আমি সর্বদা আমাদের জনগণের মর্যাদার জন্য, আমাদের জনজাতি সম্প্রদায়ের অধিকারের জন্য এবং একটি শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ ত্রিপুরার জন্য অবিচল থাকবো৷ আমি কোনো রাগ নিয়ে নয়, বরং কৃতজ্ঞতা নিয়ে সক্রিয় রাজনীতি ছাড়ছি৷ আপনারা আমাকে যে ভালোবাসা দিয়েছেন তার জন্য কৃতজ্ঞতা৷ আপনারা আমার ওপর যে আস্থা রেখেছেন তার জন্য কৃতজ্ঞতা এবং কঠিন সময়েও প্রত্যেকে যারা আমার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, সকলের জন্য কৃতজ্ঞতা৷ আমি ভুল করেছি৷ আমি হতাশার মুখোমুখি হয়েছি৷ আমি আশার আলোও দেখেছি৷ তবে এর সবকিছুর মধ্য দিয়েও, আমি ত্রিপুরাকে বিশ্বাস করা থেকে কখনো বিরত হইনি৷ এখন আমি আমার জীবনের একটি শান্ত অধ্যায় খুঁজছি, যা আমার পরিবারের কাছাকাছি, প্রকৃতির কাছাকাছি, আমার অসমাপ্ত কাজগুলির কাছাকাছি এবং সেই জ্ঞানের কাছাকাছি যা মানুষ অবশেষে কিছু নীরবতা খুঁজে পাওয়ার পরেই কেবল লাভ করতে পারে৷ ভবিষ্যতে কী আছে আমি জানি না৷ তবে আমি এটা জানি: জীবন আমাকে যেখানেই নিয়ে যাক না কেন, ত্রিপুরা সর্বদা আমার হৃদয়ে থাকবে৷ আমাদের সন্তানেরা যেন এমন এক ত্রিপুরার উত্তরাধিকার হয়, যা আরও ন্যায়পরায়ণ, আরও ঐক্যবদ্ধ এবং আরও আত্মবিশ্বাসী৷ আমাদের মানুষেরা যেন মর্যাদার সাথে বাঁচতে পারে৷ এবং যে স্বপ্ণের জন্য এত মানুষ আত্মত্যাগ করেছেন তা যেন ভোলা না হয়৷ ত্রিপুরার জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা, স্নেহ এবং একটি চিরন্তন বন্ধন সহ প্রদ্যোত মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর, ২০২৬