Pratibadi KalamPratibadi Kalam
ব্রেকিংরাজনীতি

একুশের ভোটের ভূত তাড়া করছে পদ্ম শিবিরকে

পুরভোটের দামামা বাজাতেই একুশের নির্বাচনী অঙ্ক নতুন করে ঘুম কেড়ে নিচ্ছে ত্রিপুরার শাসক দল বিজেপির। পাঁচ বছর আগের পুর নির্বাচনের ফলাফল যেন এবারও পদ্ম শিবিরের সামনে অশনি সংকেত হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্ষমতায় থাকার আত্মবিশ্বাস থাকলেও আসন্ন পুর ও নগর নির্বাচনে রাজনৈতিক সমীকরণ যে আগের মতো সহজ হবে না, তা বুঝতে পারছে শাসক শিবির। একদিকে প্রতিষ্ঠানবিরোধী ক্ষোভ, অন্যদিকে পুর পরিষেবা নিয়ে নাগরিক অসন্তোষ, তার উপর বিরোধী ভোট এক জায়গায় চলে আসার সম্ভাবনা—সব মিলিয়ে এবার পুরভোটের লড়াই বিজেপির কাছে বড়সড় রাজনৈতিক পরীক্ষা হতে চলেছে।

Pratibadi Kalam Newsroom4 মিনিট পড়া
একুশের ভোটের ভূত তাড়া করছে পদ্ম শিবিরকে

আগরতলা:: পুরভোটের দামামা বাজাতেই একুশের নির্বাচনী অঙ্ক নতুন করে ঘুম কেড়ে নিচ্ছে ত্রিপুরার শাসক দল বিজেপির। পাঁচ বছর আগের পুর নির্বাচনের ফলাফল যেন এবারও পদ্ম শিবিরের সামনে অশনি সংকেত হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্ষমতায় থাকার আত্মবিশ্বাস থাকলেও আসন্ন পুর ও নগর নির্বাচনে রাজনৈতিক সমীকরণ যে আগের মতো সহজ হবে না, তা বুঝতে পারছে শাসক শিবির। একদিকে প্রতিষ্ঠানবিরোধী ক্ষোভ, অন্যদিকে পুর পরিষেবা নিয়ে নাগরিক অসন্তোষ, তার উপর বিরোধী ভোট এক জায়গায় চলে আসার সম্ভাবনা—সব মিলিয়ে এবার পুরভোটের লড়াই বিজেপির কাছে বড়সড় রাজনৈতিক পরীক্ষা হতে চলেছে।

আর সেই কারণেই প্রার্থী বাছাইয়ে এবার পুরনো মুখের প্রভাব নয়, সবচেয়ে বড় মাপকাঠি হতে চলেছে স্বচ্ছ ভাবমূর্তি। ২০২১ সালের পুর নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করলেই বিজেপির উদ্বেগের কারণ স্পষ্ট হয়ে যায়। রাজনৈতিক মহলের হিসাব, সেবার বিরোধী ভোটের বিভাজনই একাধিক আসনে বিজেপির জয়ের পথ প্রশস্ত করেছিল। বিশেষ করে সিপিএম ও তৃণমূল কংগ্রেসের প্রাপ্ত ভোট একত্র করলে আগরতলা পুরনিগমের অন্তত ২৯টি ওয়ার্ডে বিজেপির জয়ের অঙ্ক পাল্টে যেতে পারত।

শুধু আগরতলা নয়, রাজ্যের বিভিন্ন পুর পরিষদ ও নগর পঞ্চায়েত মিলিয়ে প্রায় শতাধিক আসনে বিজেপি প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোটের তুলনায় সিপিএম ও তৃণমূলের সম্মিলিত ভোট বেশি ছিল। অর্থাৎ বিরোধীদের ভোট ভাগ না হলে বহু জায়গায় পদ্ম শিবিরের জয় অধরাই থেকে যেতে পারত। এবার সেই পুরনো অঙ্কই নতুন করে রাজনৈতিক শিবিরগুলির টেবিলে ঘুরছে। ২০২১ সালের নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস রাজ্যে জোরদারভাবে ময়দানে নামলেও বর্তমানে তাদের সাংগঠনিক শক্তি একেবারেই দুর্বল। ফলে মূল লড়াই বিজেপির সঙ্গে বাম ও কংগ্রেসের হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কিন্তু এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—বাম ও কংগ্রেস কি আসন সমঝোতায় পৌঁছতে পারবে ?

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অবস্থান সেই সম্ভাবনাকে একপ্রকার নিশ্চিত করে তুলেছে। দুই শিবির একসাথে লড়লে এবার ভোট ভাগের সুবিধা পেতে পাবে না বিজেপি। যদি একের বিরুদ্ধে এক প্রার্থী দেওয়ার সমীকরণ তৈরি হয়, তাহলে বহু ওয়ার্ডে শাসক দলের জয় কঠিন হয়ে উঠতে পারে। ২০২১ সালের ডিসেম্বর মাসে আগরতলা পুরনিগমসহ রাজ্যের পুর ও নগর পঞ্চায়েতগুলিতে নির্বাচন হয়েছিল। আগরতলা পুরনিগম, ১৩টি পুর পরিষদ এবং তিনটি নগর পঞ্চায়েত মিলিয়ে মোট ৩৭৪টি আসনের মধ্যে গতবার ২২২টি আসনে ভোট হয়েছিল বলে উল্লেখ রয়েছে। এবারও সেই নির্বাচনী ক্ষেত্রগুলিতে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে মরিয়া বিজেপি। ইতিমধ্যেই এডিসি নির্বাচনের পাশাপাশি পুর ও নগর নির্বাচনের প্রস্তুতিতেও সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়িয়েছে শাসক দল।

তবে এবার বিজেপির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কৌশল হতে পারে প্রার্থী পরিবর্তন। বিজেপি দলের একটি বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, দিল্লির নেতৃত্বের তরফে স্বচ্ছ ভাবমূর্তিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়ার বার্তা দেওয়া হয়েছে। শুধু দীর্ঘদিনের দলীয় কর্মী কিংবা স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী হলেই টিকিট পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। কমিশন বাণিজ্য, তোলাবাজি, জমির দালালি কিংবা স্বজনপোষণের মতো অভিযোগ যাঁদের বিরুদ্ধে উঠেছে, তাঁদের প্রার্থী করার ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান নিতে পারে দলীয় নেতৃত্ব। আগরতলা পুরনিগমের একাধিক বর্তমান কর্পোরেটরের কাজের মূল্যায়ন এবং তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। ফলে এবার এক ঝটকায় একাধিক পুরনো মুখ বাদ পড়লেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

একুশের নির্বাচনের কয়েকটি ওয়ার্ডের ফলাফল বিজেপির জন্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯ নম্বর ওয়ার্ডে বিজেপি প্রার্থী ভাস্বতি দেববর্মা ১,০২০ ভোট পেয়ে মাত্র ৯০ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন। সেখানে সিপিএম পেয়েছিল ৯৩৬ এবং তৃণমূল পেয়েছিল ৫৩৮ ভোট। অর্থাৎ দুই বিরোধী দলের ভোট একত্র করলে দাঁড়ায় ১,৪৭৪। পাঁচ নম্বর ওয়ার্ডে বিজেপির লতা নাথ পেয়েছিলেন ২,৫৮৫ ভোট। অন্যদিকে তৃণমূলের ১,৫৬২ এবং সিপিএমের ১,৭৭২ ভোট মিলিয়ে দাঁড়ায় ৩,৩৩৪। একইভাবে আরেকটি ওয়ার্ডে বিজেপির ২,৫০৬ ভোটের বিপরীতে বাম ও তৃণমূলের সম্মিলিত ভোট ছিল ৩,০১০। আট নম্বর ওয়ার্ডেও বিজেপির ২,৭২১ ভোটের বিপরীতে বিরোধীদের সম্মিলিত ভোট ছিল ৩,২৫০।

এই পরিসংখ্যানই দেখিয়ে দেয়, ভোটের ময়দানে বিরোধী ঐক্যের সম্ভাব্য প্রভাব কতটা বড় হতে পারে। রাজ্যের অন্যান্য পুর এলাকাতেও একই ধরনের চিত্র সামনে এসেছিল। সোনামুড়া নগর পঞ্চায়েতের চারটি, খোয়াই পুরসভার চারটি, তেলিয়ামুড়া পুর পরিষদের চারটি এবং আমবাসা পুরসভার ১৫টির মধ্যে আটটি ওয়ার্ডে সিপিএম ও তৃণমূলের সম্মিলিত ভোট বিজেপির চেয়ে বেশি ছিল বলে দাবি করা হয়েছে। অর্থাৎ বিরোধীদের ভোট বিভাজন শাসক দলের নির্বাচনী সুবিধার অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছিল। তবে এবার পরিস্থিতি শুধু ভোটের অঙ্কে আটকে নেই। গত পাঁচ বছরে স্থানীয় স্তরে জনপ্রতিনিধিদের কাজ, পুর পরিষেবার মান, পানীয় জল, নিকাশি, রাস্তা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নাগরিক সমস্যার সমাধান নিয়ে মানুষের মূল্যায়নও ভোটে প্রভাব ফেলতে পারে।

কয়েকজন জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে দুর্নীতি, স্বজনপোষণ, জমি সংক্রান্ত অনিয়ম এবং আত্মীয়স্বজনকে চাকরির সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগও রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় হয়ে উঠেছে। যদিও এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রমাণ প্রয়োজন, তবু ভোটের আগে এই ইস্যুগুলি বিরোধীদের প্রচারের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। ২০২১ সালের নির্বাচনে বিরোধীরা বুথ জ্যাম, হামলা ও ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ তুলেছিল। এবার নির্বাচন কতটা অবাধ, শান্তিপূর্ণ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিরোধীরা যদি সমানভাবে প্রচার, প্রার্থী দেওয়া এবং ভোটারদের কাছে পৌঁছনোর সুযোগ পায়, তাহলে লড়াইয়ের প্রকৃত শক্তি অনেকটাই স্পষ্ট হবে। সব মিলিয়ে একুশের পুরভোটের পরিসংখ্যান এবার বিজেপির কাছে শুধুই অতীতের হিসাব নয়, বরং ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সতর্কবার্তা। একদিকে প্রতিষ্ঠানবিরোধী ক্ষোভ, অন্যদিকে দুর্বল পুর পরিষেবা নিয়ে নাগরিক অসন্তোষ, তার উপর বাম-কংগ্রেসের সম্ভাব্য সমীকরণ—সবকিছু মিলিয়ে পদ্ম শিবিরের সামনে চ্যালেঞ্জ ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে।

তাই স্বচ্ছ ভাবমূর্তির নতুন প্রার্থী সামনে এনে পুরনো ক্ষত ঢাকার চেষ্টা কতটা সফল হবে, তা সময়ই বলবে। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট, বিরোধীরা যদি এবার ভোট ভাগাভাগির রাজনীতি থেকে বেরিয়ে একজোট হতে পারে, তাহলে ২০২১ সালের জয়ের পুনরাবৃত্তি বিজেপির পক্ষে মোটেই সহজ হবে না। কারণ পুরভোটে শুধু দলীয় প্রতীক নয়, মানুষের ক্ষোভ, জনপ্রতিনিধিদের কাজ এবং পাঁচ বছরের হিসাবও ভোটের বাক্সে প্রতিফলিত হয়। এবার পদ্ম শিবিরের সামনে তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—প্রার্থী বদলে কি জনমতের বদল ঘটানো সম্ভব ? নাকি একুশের অঙ্কই শেষ পর্যন্ত গেরুয়া শিবিরের রাজনৈতিক দুর্গে ধস নামাবে ?