জুটমিল যন্ত্রপাতি ৩ কোটি ৪৬ লক্ষ টাকার ই-নিলাম ঘিরে তীব্র প্রশ্ন, কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে অনিশ্চয়তায় শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ
একসময় ত্রিপুরার শিল্পায়নের অন্যতম পরিচয় ছিল হাপানিয়ার ত্রিপুরা জুট মিলস লিমিটেড। অথচ সেই সরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পুরনো, মেরামতযোগ্য উৎপাদন যন্ত্রপাতি, ওয়ার্কশপ ও ইউটিলিটি বিভাগের মেশিনারি এবার একসঙ্গে নিলামে বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। ৩ কোটি ৪৬ লক্ষ ৪৪ হাজার টাকা সংরক্ষিত মূল্য ধার্য করে প্রকাশিত ই-নিলামের বিজ্ঞপ্তি সামনে আসতেই জুটমিলের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

আগরতলা ::একসময় ত্রিপুরার শিল্পায়নের অন্যতম পরিচয় ছিল হাপানিয়ার ত্রিপুরা জুট মিলস লিমিটেড। অথচ সেই সরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পুরনো, মেরামতযোগ্য উৎপাদন যন্ত্রপাতি, ওয়ার্কশপ ও ইউটিলিটি বিভাগের মেশিনারি এবার একসঙ্গে নিলামে বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
৩ কোটি ৪৬ লক্ষ ৪৪ হাজার টাকা সংরক্ষিত মূল্য ধার্য করে প্রকাশিত ই-নিলামের বিজ্ঞপ্তি সামনে আসতেই জুটমিলের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। শ্রমিকদের আশঙ্কা, এভাবে ধাপে ধাপে যন্ত্রপাতি বিক্রি করে কি শেষ পর্যন্ত মিলের উৎপাদন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ গুটিয়ে ফেলার পথ তৈরি করা হচ্ছে ? ত্রিপুরা জুট মিলস লিমিটেডের নম্বর F.T JML/DISPOSAL/2026/413, তারিখ ৩১ অক্টোবর ২০২৬-এ এক বিজ্ঞপ্তিতে ই-নিলামের আহ্বান করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে স্বাক্ষর করেছেন সংস্থার কমার্শিয়াল অফিসার আর. পি. দত্ত।
বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, পুরনো কিন্তু মেরামতযোগ্য প্ল্যান্ট ও মেশিনারি—যার মধ্যে জুট উৎপাদন, ওয়ার্কশপ এবং ইউটিলিটি বিভাগের যন্ত্রপাতি রয়েছে—একটি সমন্বিত একক লট হিসেবে বিক্রি করা হবে। নিলাম আইডি ECA_2026_TJML_2084, নিলামের তারিখ ৩০ অক্টোবর ২০২৬ এবং সংরক্ষিত মূল্য ৩,৪৬,৪৪,০০০ টাকা। দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ১৯ নভেম্বর ২০২৬। ‘As-is, Where-is’ অর্থাৎ যেখানে যে অবস্থায় রয়েছে, সেই অবস্থাতেই সম্পদ বিক্রির শর্ত রাখা হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, যে যন্ত্রপাতিগুলিকে বিজ্ঞপ্তিতেই ‘মেরামতযোগ্য’ বলা হয়েছে, সেগুলি মেরামত করে উৎপাদন পুনরায় চালুর সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হয়েছে কি ? নাকি সেগুলি বিক্রি করে দেওয়াই এখন কর্তৃপক্ষের অগ্রাধিকার ? কোন কোন যন্ত্রপাতি বিক্রি করা হবে, সেগুলির বর্তমান অবস্থা কী, মূল্যায়ন কোন সংস্থা করেছে এবং ৩ কোটি ৪৬ লক্ষ ৪৪ হাজার টাকার সংরক্ষিত মূল্য কীভাবে নির্ধারিত হলো ? বিশেষ করে উৎপাদনের কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি বিক্রি হলে ভবিষ্যতে মিল চালুর সম্ভাবনা কতটা থাকবে ?
এইসব প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই ত্রিপুরার ডাবল ইঞ্জিনের সরকারের। আসন্ন আগরতলা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন সহ রাজ্যের বিভিন্ন পৌর পরিষদ ও নগর পঞ্চায়েত নির্বাচনকে সামনে রেখে ত্রিপুরা জুটমিলের যন্ত্রপাতি নিলামের সিদ্ধান্ত শাসকদল বিজেপির জন্য নতুন রাজনৈতিক অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠতে পারে। একদিকে উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি, অন্যদিকে সরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মেরামতযোগ্য উৎপাদন যন্ত্রপাতি ৩ কোটি ৪৬ লক্ষ ৪৪ হাজার টাকা সংরক্ষিত মূল্যে নিলামে বিক্রির উদ্যোগ—এই বৈপরীত্য নির্বাচনী প্রচারে বিরোধীদের হাতে নতুন অস্ত্র তুলে দিতে পারে।
আগরতলার ভোটারদের সামনে যখন উন্নয়নের খতিয়ান তুলে ধরবে শাসকদল, তখন জুটমিলের শ্রমিক ও তাঁদের পরিবারের প্রশ্নও সামনে আসতে পারে—শিল্প বাঁচাতে এবং কর্মসংস্থান রক্ষা করতে সরকার কী পদক্ষেপ নিয়েছে ? পৌর নির্বাচনের ময়দানে রাস্তা, পানীয় জল, নিকাশি ও নাগরিক পরিষেবার পাশাপাশি এবার শিল্পের ভবিষ্যৎ এবং শ্রমিকদের জীবিকার প্রশ্নও রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে আসতে পারে। জুটমিলের যন্ত্রপাতি বিক্রির সিদ্ধান্তের পিছনে কী যুক্তি, নিলামের অর্থ কোথায় ব্যবহার হবে এবং মিল পুনরুজ্জীবনের কোনও পরিকল্পনা আদৌ রয়েছে কি না—এই প্রশ্নগুলির স্পষ্ট উত্তর না মিললে নির্বাচনী প্রচারে বিজেপিকে অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখে পড়তে হতে পারে। কারণ, উন্নয়নের স্লোগান যতই জোরালো হোক, সরকারি শিল্পের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত রেখে কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতির বিশ্বাসযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করা কঠিন।
প্রসঙ্গত জুটমিলের আর্থিক সংকট অবশ্য নতুন নয়। ত্রিপুরা বিধানসভার পাবলিক আন্ডারটেকিংস কমিটির ৫০তম প্রতিবেদনে অতীতে মিলের উৎপাদনক্ষমতার তুলনায় কম উৎপাদন, কাঁচা পাটের অপ্রতুলতা, কার্যকরী মূলধনের অভাব এবং যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণের সমস্যার কথা উঠে এলেও বিগত আট বছরের বিজেপি শাসনে ঐ সকল সমস্যার সমাধানে কোন দূশ্যমান পদক্ষেপ রাজ্যবাসীর নজরে আসেনি।
অন্যদিকে, ষোড়শ অর্থ কমিশনের জন্য প্রস্তুত ত্রিপুরা-সংক্রান্ত মূল্যায়ন ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে লোকসানের পরিমাণ দেখানো হয়েছে ৯৩.৬১ কোটি টাকা। অর্থাৎ সংকটের শিকড় বহুদিনের; কিন্তু সেই সংকট থেকে উত্তরণের পরিকল্পনা কোথায় ? সবচেয়ে বড় প্রশ্ন শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ নিয়ে। যাঁদের শ্রমে এই শিল্পপ্রতিষ্ঠান একসময় সচল ছিল, তাঁদের বকেয়া পাওনা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা নিয়েই যখন দীর্ঘদিন ধরে টানাপোড়েন চলছে, তখন উৎপাদনের যন্ত্রপাতি বিক্রির সিদ্ধান্ত তাঁদের অনিশ্চয়তা আরও বাড়াবে—এমন আশঙ্কা অমূলক নয়।
উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত মেরামতযোগ্য যন্ত্রপাতি বিক্রির উদ্যোগ, দীর্ঘদিনের লোকসান, শ্রমিকদের বকেয়া—সব মিলিয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে এখন প্রশ্নের পাহাড়। এই পরিস্থিতিতে রাজ্য সরকার ও মিল কর্তৃপক্ষকে স্পষ্ট করতে হবে—এই নিলামের পর উৎপাদন চালু রাখার কোনও পরিকল্পনা আছে কি না, কতজন শ্রমিকের কর্মসংস্থান সুরক্ষিত থাকবে এবং নিলাম থেকে প্রাপ্ত অর্থ কোথায় ও কীভাবে ব্যবহার করা হবে।
সরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের যন্ত্রপাতি বিক্রির সিদ্ধান্ত শুধু একটি বাণিজ্যিক প্রক্রিয়া নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শ্রমিকের জীবিকা, রাজ্যের শিল্পভবিষ্যৎ এবং সরকারি সম্পদের জবাবদিহি। যা শাসকদলের কাছে এখন মাথা ব্যাথার কারন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারন কোন বিতর্কিত সিদ্ধান্ত আসন্ন আগরতলা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন সহ রাজ্যের বিভিন্ন পৌর পরিষদ এবং নগর পঞ্চায়েতের নির্বাচনে জুটমিলের মেরামত যোগ্য কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতির নিলাম শাসকদলের জন্য বড়সড় বিপদ ডেকে আনতে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত।