বিনামূল্যে খাদ্যসামগ্রী থেকে শিক্ষক নিয়োগ
পাশাপাশি এলিমেন্টারি এডুকেশন দপ্তরের অধীনে আরও ৩৬১ জন শিক্ষক নিয়োগ করা হবে৷ এর মধ্যে রয়েছেন ৭৫ জন গ্র্যাজুয়েট টিচার এবং ২৮৬ জন আন্ডার গ্র্যাজুয়েট টিচার৷ সরকারের এই সিদ্ধান্তে একদিকে যেমন রাজ্যের বিদ্যালয়গুলিতে শিক্ষক সংকট কমবে, তেমনই শিক্ষাক্ষেত্রে গুণগত মানোন্নয়নের পথ আরও প্রশস্ত হবে৷

প্রতিবাদী কলম প্রতিনিধি, আগরতলা, ৭ অক্টোবর৷৷ শারদোৎসবের আনন্দকে আরও সর্বজনীন করে তুলতে রাজ্যের সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আরও একটি জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ গ্রহণ করল ত্রিপুরা সরকার৷ আসন্ন দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে রাজ্যের প্রায় ৯ লক্ষ ৯২ হাজার রেশন ভোক্তাকে বিনামূল্যে চিনি, ময়দা ও সুজি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ্য মন্ত্রিসভা৷
গতকাল অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়৷ সরকারের এই উদ্যোগে উৎসবের মরশুমে সাধারণ ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলির আর্থিক স্বস্তি যেমন বাড়বে, তেমনি পুজোর আনন্দেও নতুন মাত্রা যোগ হবে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল৷ মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতিটি রেশন কার্ডধারী পরিবারকে বিনামূল্যে ১ কেজি চিনি, ২ কেজি ময়দা এবং ৫০০ গ্রাম সুজি প্রদান করা হবে৷ অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি সময়ে, অর্থাৎ দুর্গাপূজা ও লক্ষ্মীপূজার মধ্যবর্তী সময়ে এই বিশেষ খাদ্যসামগ্রী বিতরণ শুরু করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে৷ আজ সচিবালয়ে এক সাংবাদিক সম্মেলনে গতকালের মন্ত্রিসভার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা তুলে ধরতে গিয়ে খাদ্য, পরিবহণ ও পর্যটন দপ্তরের মন্ত্রী সুশান্ত চৌধুরী এই ঘোষণা করেন৷ তিনি জানান, উৎসবের মরশুমে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং তাঁদের পুজোর আনন্দকে আরও স্বস্তিদায়ক করে তোলার লক্ষ্যেই এই বিশেষ বরাদ্দের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে৷
এই কর্মসূচির আওতায় মোট ২৪৩ মেট্রিক টন সুজি, ১,৯৮৪ মেট্রিক টন ময়দা এবং ৯৯২ মেট্রিক টন চিনি বিতরণ করা হবে৷ এই বিপুল পরিমাণ খাদ্যসামগ্রী বিনামূল্যে বিতরণে রাজ্য সরকারের আনুমানিক ৯ কোটি ৩৫ লক্ষ থেকে ৯ কোটি ৮৫ লক্ষ টাকা ব্যয় হবে৷ সরকারের এই সিদ্ধান্তকে নিছক একটি খাদ্যসামগ্রী বিতরণ কর্মসূচি হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা৷ উৎসবের সময়ে বাজারদরের চাপের মধ্যে সাধারণ পরিবারগুলির পাশে দাঁড়িয়ে তাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রীর ক্ষেত্রে কিছুটা আর্থিক সুরাহা দেওয়ার একটি মানবিক প্রয়াস হিসেবেই এই উদ্যোগকে দেখা হচ্ছে৷ বিশেষ করে পুজোর সময়ে মিষ্টান্ন ও অন্যান্য খাদ্যসামগ্রী তৈরিতে চিনি, ময়দা ও সুজির ব্যবহার ব্যাপক হওয়ায় সরকারের এই বিনামূল্যে বিতরণ কর্মসূচি সাধারণ মানুষের জন্য যথেষ্ট সহায়ক হবে বলে মনে করা হচ্ছে৷ শুধু খাদ্যসামগ্রী বিতরণ নয়, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ্য মন্ত্রিসভা৷ রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি যুবসমাজের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে মোট ১,০৬১ জন শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে৷ এর মধ্যে মাধ্যমিক শিক্ষা দপ্তরের অধীনে নবম ও দশম শ্রেণির জন্য ৭০০ জন গ্র্যাজুয়েট টিচার নিয়োগ করা হবে৷
পাশাপাশি এলিমেন্টারি এডুকেশন দপ্তরের অধীনে আরও ৩৬১ জন শিক্ষক নিয়োগ করা হবে৷ এর মধ্যে রয়েছেন ৭৫ জন গ্র্যাজুয়েট টিচার এবং ২৮৬ জন আন্ডার গ্র্যাজুয়েট টিচার৷ সরকারের এই সিদ্ধান্তে একদিকে যেমন রাজ্যের বিদ্যালয়গুলিতে শিক্ষক সংকট কমবে, তেমনই শিক্ষাক্ষেত্রে গুণগত মানোন্নয়নের পথ আরও প্রশস্ত হবে৷ একই সঙ্গে রাজ্যের শিক্ষিত যুবক-যুবতীদের জন্য সরকারি চাকরির নতুন সুযোগ তৈরি হওয়ায় কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও এটি একটি তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ বলে মনে করা হচ্ছে৷ নগর পরিষেবা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করে তুলতে আগরতলা পুরনিগমেও বিভিন্ন শ্রেণির মোট ২১৩টি পদে নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ্য সরকার৷ নগর উন্নয়ন দপ্তরের অধীনে এই নিয়োগ করা হবে৷ এই পদগুলির মধ্যে বিভিন্ন কারিগরি, প্রশাসনিক ও পরিষেবা সংক্রান্ত পদ রয়েছে৷
এর ফলে আগরতলা পুরনিগমের প্রশাসনিক ও পরিষেবা ব্যবস্থায় জনবল বৃদ্ধি পাবে এবং নাগরিকদের আরও দ্রুত ও দক্ষ পরিষেবা প্রদান করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন মন্ত্রী সুশান্ত চৌধুরী৷ তিনি আরও জানান, রাজ্য সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত, স্বচ্ছ ও সুসংগঠিত করার লক্ষ্যে ‘ত্রিপুরা স্টাফ সিলেকশন কমিশন’ গঠনের সিদ্ধান্তও নিয়েছে মন্ত্রিসভা৷ এই কমিশনের মাধ্যমে রাজ্য সরকারের অধীনস্থ গ্রুপ-বি, গ্রুপ-সি এবং গ্রুপ-ডি পদে নিয়োগের পরীক্ষা পরিচালনা এবং কর্মী নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে৷ একটি পৃথক ও সুসংগঠিত নিয়োগ কমিশনের মাধ্যমে সরকারি চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়া পরিচালিত হলে সময়ের অপচয় কমার পাশাপাশি নিয়োগ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা আরও বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে৷ চাকরিপ্রার্থীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণের ক্ষেত্রেও এই সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে৷ মন্ত্রিসভার বৈঠকে সামাজিক কল্যাণের ক্ষেত্রেও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে৷
তপশিলি জাতি কল্যাণ দপ্তরের অধীনস্থ ওয়েলফেয়ার সাব-কমিটির চেয়ারম্যান ও সদস্যদের প্রতি বৈঠকের সিটিং অ্যালাউন্স ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০০ টাকা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে৷ সংখ্যালঘু কল্যাণের ক্ষেত্রেও নেওয়া হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ৷ আবাসিক বোর্ডিং হাউসে থাকা শিক্ষার্থীদের দৈনিক বোর্ডিং হাউস স্টাইপেন্ড ৬৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০০ টাকা করা হয়েছে৷
এর ফলে আবাসিক বোর্ডিংয়ে থেকে পড়াশোনা করা ছাত্রছাত্রীদের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে কিছুটা অতিরিক্ত সহায়তা মিলবে৷ এছাড়াও বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও পরিবেশ দপ্তরের অধীনে দীর্ঘদিনের ৮টি লোয়ার ডিভিশন ক্লার্কের শূন্যপদ পূরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে৷ সব মিলিয়ে, গতকালের মন্ত্রিসভার একাধিক সিদ্ধান্তে একইসঙ্গে জনকল্যাণ, খাদ্য সুরক্ষা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, নগর পরিষেবা, সামাজিক সুরক্ষা এবং প্রশাসনিক সংস্কারের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে৷ বিশেষ করে উৎসবের মরশুমে প্রায় ৯ লক্ষ ৯২ হাজার রেশন ভোক্তাকে বিনামূল্যে চিনি, ময়দা ও সুজি দেওয়ার সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের প্রতি সরকারের দায়বদ্ধতা ও জনমুখী প্রশাসনেরই প্রতিফলন বলে মনে করছে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহল৷ শারদোৎসবের প্রাক্কালে এই উদ্যোগে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের সংসারে কিছুটা আর্থিক স্বস্তি আসবে, অন্যদিকে শিক্ষক ও পুরনিগমে নিয়োগের সিদ্ধান্তে কর্মসংস্থানের নতুন দুয়ার খুলবে৷ ফলে মন্ত্রীসভার সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তগুলিকে ‘উৎসবের আনন্দের সঙ্গে জনকল্যাণ ও কর্মসংস্থানের সমন্বিত বার্তা’ হিসেবেই দেখছেন অনেকে৷